ASSAM
নীতীশ বিশ্বাস, সমাজ ভাষা গবেষক বাঙালির মহান শিক্ষাগুরু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় 'দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁর অক্ষয় মনুষ্যত্ব।' তিনি আরো বলেছিলেন;— তার "বাঙালি চরিত্রে দয়ার সাগর ও বিদ্যার সাগর একসাথে মিশেছে"। -এই সব ধ্রুপদি অভিমত ছাড়াও তার জীবনের মহান ব্রত সাধনেযে তীব্র সংগ্রাম করতে হয়েছিলো সে তার বিধবা বিবাহ ও নারী শিক্ষা আন্দোলন। এ ক্ষেত্রেতার পূর্ব সূরী ছিলেন উদার শিক্ষাপরিবেশ থেকে উঠে আসা রামমোহন রায় ১০টি ভাষার পান্ডিত্ব নিয়ে শাস্ত্রকে অস্ত্রেরমতো ব্যবহার করে সতীদাহ রোধে করেছিলেন। সেই পথে আরো গভীরে গিয়ে বিদ্যাসাগর এক শানিত যুদ্ধের মাধ্যমে মাতৃমুক্তির জন্য বিধবা বিবাহের আইনপাশকরে অগণিত বিধবাকে নতুন জীবন দিতে চেয়েছিলেন । দুজনেই বাঙালি নবজাগরণের স্তম্ভ। এই কুসুমে কোমলে গড়ে ওঠা এক উন্নত মানব বিদ্যাসাগর জন্মেছিলেন আমাদের এই বর্ণ লাঞ্ছিত, কুসংস্কারে আচ্ছাদিত বাঙালি সমাজে। সেই সূর্যসম ব্যক্তিত্বের আজ জন্ম দিন। যার আবির্ভাবে আড়াইশো বছর ধরে অনেক আঁধার কেটেছে আর আজকের ঘন-দুর্যোগের রাতে তার আলো আমাদের জাতিকে রক্ষা করুক- এই প্রার্থনা এই পুন্য দিনে।
জীবন কথাঃ বিদ্যাসাগর জন্মেছিলেন মেদিনীপুরের বীরসিংহ-গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। মাতা ভগবতী দেবী। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের পাঠশালায়। পরে পদব্রজে কলকাতায় আসেন এবং ১৮২৯ খ্রি. ১ জুন সংস্কৃত কলেজে ভরতি হন। একাদি ক্রমে ১২ বছর কাব্য, ব্যাকরণ, অলংকার, বেদান্ত, স্মৃতি, ন্যায়, জ্যোতিষ প্রভৃতি পাঠ করে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। অবশেষে ১৮৩৯ খ্রি. হিন্দু ল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর 'বিদ্যাসাগর' উপাধি পান। ১৮৪১ খ্রি. ২৯ ডিসেম্বরে হেড পন্ডিতের চাকরীপান ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে ।এখানে আসার পর ইংরেজি ও হিন্দি শিক্ষায় মনোনিবেশে করেন । ১৮৪৬ খ্রি. ৬ এপ্রিলে কলেজের সহ-সম্পাদক হয়েও তার কলেজ- সংস্কারের প্রস্তাব সম্পাদক অগ্রাহ্য করলে তিনি ১৮৪৭ খ্রি. ১৬ জুলাই পদত্যাগ করেন। অবশ্য তার কিছুদিন পরেই ১৮৫০ খ্রি. উক্ত কলেজের সাহিত্যাধ্যাপকের পদগ্রহণ করেন। তবে; শর্ত ছিল তাঁর প্রস্তাব মতো কলেজ-সংস্কার করতে হবে। এই সময়ে সম্পাদক রসময় দত্ত অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ১৮৫১ খ্রি. অধ্যক্ষপদে নিযুক্ত হয়ে কলেজের সর্ববিভাগের ঐতিহাসিক সংস্কার সাধন করেন। সে কলেজের ছূটির দিন পরিবর্তন,মাইনে প্রবর্তন,জটিল ব্যাকরণ মুগ্ধবোধের পরিবর্তে সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা (পরে ব্যাকরণ কৌমুদী) রচনা করেন। গণিতে ইংরেজি ব্যবহার এবং পাঠক্রমে করে বেদান্তকে ভুয়ো দর্শন বলে বাদ দিয়ে ঢোকালেণ মিলের লজিক বা যুক্তি শাস্ত্র। তার সময়েই সংস্কৃত কলেজে অব্রাহ্মণের প্রবেশাধিকার ঘটে। এ প্রসঙ্গে তার সীমা বদ্ধতা ছিলনা তা নয়। তিনি তার সহকর্মী পন্ডিতদের অন্ধ-মানসিকতা জানতেন, তাই শূদ্রদের মধ্যে তখন কেবল উচ্চ কায়স্থকে প্রথমে যুক্ত করেন। তার চেয়ে বেশি অগ্রসর হননি। বিদ্যাসাগর বিশেষজ্ঞ বিনয় ঘোষ তার বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ গ্রন্থে (৫৩৯-৪৭ পাতায় ) যে সব দলিল সংকলিত করেছেন, তা সময়েরবিচারে প্রনিধান যোগ্য।
শিক্ষা আন্দোলনঃ বাংলা শিক্ষা ও বাঙালির শিক্ষা প্রসারে তার ছিলো সুবিশাল অবদান। সে সরকারকে বুঝিয়ে বাংলার জেলায় জেলায় ২০টি মডেল স্কুল খোলেন। এইসব স্কুলের শিক্ষকদের শিক্ষণ-পদ্ধতি শিক্ষার জন্য নিজ তত্ত্বাবধানে 'নর্মাল স্কুল' প্রতিষ্ঠা করেন (১৮৫৫)। এর পরিচালক করে ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্তকে। ১৮৫৭ খ্রি. প্রতিষ্ঠিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য ছিলেন। ১৯৫৯ খ্রি. 'ক্যালকাটা ট্রেনিং স্কুল' প্রতিষ্ঠার পর ১৮৬৪ খ্রি. এই প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব তাঁর হাতে আসে। এই স্কুলই প্রথমে 'হিন্দু মেট্রোপলিটান ইনস্টিটি উশন' এবং পরে ১৮৭২ খ্রি. কলজে রূপান্তরিত হয়, ( বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) । দেশীয় অধ্যাপকগণ দ্বারাই এই কলেজে ইংরেজি সাহিত্য পড়ানো হোত।
না রী শিক্ষাঃতার সময়ে হিন্দু সমাজে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো পাপ মনে করা হতো। এই অন্ধকার যুগে সরকার কর্তৃক বিশেষ স্কুল ইনেস্পেক্টর নিযুক্ত হওয়ার পরেই যেমন ২০টি মডেল স্কুল স্থাপন করেন। তেমনি ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় পরিচালনা করেন । স্ত্রীশিক্ষার সেই আদি(১৮৫৮)যুগেই বিদ্যাসাগর-প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়গুলির ছাত্রী সংখ্যা ছিল ১৩০০ ।তিনি ১৮৫৭-৫৮ সালে নদীয়া, বর্ধমান, হুগলিতে নিজের খরচে এই ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় করেন। বেথুন স্কুলের সম্পাদক হয়ে মেয়েদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা চালু করেন। বলতেন — "একজন পুরুষ শিক্ষিত হলে একজন শিক্ষিত হয়, একজন নারী শিক্ষিত হলে গোটা পরিবার শিক্ষিত হয়। শিক্ষা যাতে শুধু কলকাতায় আটকে না থাকে, গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে — এটাই ছিলো তার পরিকল্পনা। আমাদের জানা মতে এই কাজ গ্রাম বাংলায় আর করেছিলেন ফরিদপুরের হরিচাঁদ ঠাকুর (১৮১২-১৯৪১) ও তার পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর (১৮৪৬-১৯৩৭)। তারা হাই স্কুল,বালিকা স্কুল সহ খুলেছিলেন কয়েক হাজার গ্রাম্য পাঠশালা । এই আন্দোলনের শীর্ষে ছিলেন ভারতের দলিত শিক্ষাগুরু মহারাষ্ট্রের জ্যোতিরাও ফুলে (১৮২৭ - ১৮৯০ ) ও তার স্ত্রী সাবিত্রীবাই ফুলে(১৮৩১ - ১৮৯৭ )।তারাই ভারতের প্রকৃত নারী ও দলিত শিক্ষার তথা গণ শিক্ষার জনক জননী।
বাংলা গদ্যের জনকঃ বর্ণপরিচয় (১৮৫৫) দিয়েই আজও বাঙালি অক্ষর চেনে। যতি চিহ্ন, সরল গদ্য তারই সৃষ্টি। বাংলা ভাষার শিক্ষা ও বিকাশে সব্যসাচী-বিদ্যাসাগরের অবদানের তুলনা নেই।তিনি প্রশাসক হিসেবে সার্বিক উন্নয়নের পরিবেশ ও পরিকাঠামো সৃজন করছেন আর লেখক অনুবাদক শিক্ষক হিসেবে পাঠ্যের উপযোগী গ্রন্থ রচনা করছেন। ছাত্রদের প্রয়োজন মেটাতেই তিনি বাংলা ভাষায় বই লেখা শুরু করেন, যাতে ইংরেজি না জানলেও শিক্ষা হয়। ক্রমে স্কুল বিভাগের সর্বস্তরে শিক্ষার জন্য বহুবিধ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন যেমন বোধোদয়, বর্ণপরিচয়, কথামালা , 'চরিতাবলী', 'ঋজুপাঠ' প্রভৃতি। বাংলা ভাষার দেহে রক্তসঞ্চালনের জন্য ও সংস্কৃত-সিক্ত বাংলাকে মুক্তির স্বাদ দিতে নতুন ভাবে লিখলেন বেতাল পঞ্চবিংশতি', 'শকুন্তলা', 'সীতার বনবাস' প্রভৃতি। যে রচনা্র মাধ্যমে তিনি সাহিত্যের নতুন দিক-নির্দেশ করেন। এ ছাড়াও 'রঘুবংশ', 'সর্বদর্শন সংগ্রহ', 'কুমারসম্ভব', 'কাদম্বরী', 'মেঘদূত', 'উত্তররামচরিত', 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম্' প্রভৃতি গ্রন্থ সম্পাদনা করেন। সহকর্মী মদন মোহন তর্কালঙ্কারের সঙ্গে 'সংস্কৃত-প্রেস'ও স্থাপন করেন।
বিধবা বিবাহঃ ১৮৫৪-৫৫ খ্রি. বিধবা বিবাহ প্রচলন-প্রয়াস চালান। শাস্ত্র ঘেঁটে 'পরাশর সংহিতা' থেকে প্রমাণ করেন বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত। ১৮৫৫ সালে হাজার স্বাক্ষর সহ আবেদন করে ১৮৫৬ সালের ২৬শে জুলাই Hindu Widows' Remarriage Act XV পাশ করান। ১৮৫৬ সালের ৭ই ডিসেম্বর প্রথম বিধবা বিবাহ দেন নিজের ছেলের বন্ধুর সাথে, নিজে উপস্থিত থেকে। নিজের ছেলে নারায়ণচন্দ্রকেও বিধবার সাথে বিয়ে দেন। প্রায় ৬০টির বেশি বিধবা বিবাহ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দিয়েছিলেন।তবুও কেন পূর্ণ সফল হল না? উচ্চবর্ণের রক্ষণশীলরা তাকে 'বিধবা-বিবাহের ঠাকুর' বলে ব্যঙ্গ করত, সামাজিক বয়কট করত।আর ছিলো অর্থনৈতিক কারণ। বিধবাদের সম্পত্তির অধিকার ছিল না, তাই দ্বিতীয় বিয়ে করলে পরিবার তাদের ত্যাজ্য করত। আইন পাশ হলেও পুলিশ বা সমাজ তা মানতে বাধ্য করত না। তিনি নিজেই শেষ জীবনে হতাশ হয়ে বলেছিলেন — "বিধবা বিবাহ আন্দোলন আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও কম সফল কাজ।" আজথেকে প্রায় ২০০বছর আগের অত্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন হিন্দু সমাজে বহুবিবাহ-রোধ আন্দোলন ব্যর্থ হয়,সমাজপতিদের প্রবল বাধাঁয় আর সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকারের ভীত হয়ে পড়ে,তাই । এই উপলক্ষ্যে শিক্ষিত মহলে তীব্র বাদানুবাদের সৃষ্টি হলে বিদ্যাসাগর সম্পূর্ণ নূতন ভঙ্গিতে সরস ও বিদ্রূপাত্মক নিবন্ধ রচনা করেন। গ্রন্থাকারে সেগুলির নাম- 'কস্যচিৎ ভাইপোস্য', 'অতি অল্প হইল', 'আবার অতি অল্প হইল' (১৮৭৩)। হিন্দু বিধবাদের দুরবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি 'হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুয়িটি ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করেন।
সারা জীবন কঠোর সংগ্রামী, স্বাজাত্যাভিমানী আর কোনো কারণেই আপস না করা।— এই ছিল বিদ্যাসাগরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। ফলে শেষজীবনে আত্মীয়-বন্ধুজন থেকে দূরে কার্মাট…সাঁওতালদের মধ্যে বসবাস করতেন। তাদের সরল সান্নিধ্যই তার জীবনের ছিলো শ্যামল পূর্ণতা ।
বাঙালির শিক্ষক দিবস! বর্ণবাদী কুসংস্কারে নিমজ্জিত বঙ্গ সমাজের মানবিক সংস্কার , বাংলা গদ্যের সুস্বাস্থ্য ও সৈন্দর্য সৃজণ তথা বাংলা গদ্যের জনক বিদ্যাসাগর আজও সমগ্র বাংলা বিশ্বের অদ্বিতীয় ও আদর্শ শিক্ষক। তাই আমাদের মতো সাধারণ ভাষাকর্মী থেকে কলকাতার প্রখ্যাত ভাষা বিদ পবিত্র সরকার, প্রাচীন সাহিত্য বিশারদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি, কবি জয় গোস্বামী, প্রাঃ উপাচার্য সবুজকলি সেন সহ অনেকেই চেয়েছেন বিদ্যাসাগরের জন্ম দিন বাংলার শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হোক । কারণ বিদ্যাসাগর হলেন আমাদের ঘরে ঘরে বাংলা বর্ণমালা পৌঁছে দেওয়ার মহান পথিকৃৎ বা কারিগর। তাই বাংলার শিক্ষা দিবস হিসেবে তাঁর জন্মদিন সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক দিন বলে আমাদেরও মনে হয়।
জীবন কথাঃ বিদ্যাসাগর জন্মেছিলেন মেদিনীপুরের বীরসিংহ-গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। মাতা ভগবতী দেবী। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের পাঠশালায়। পরে পদব্রজে কলকাতায় আসেন এবং ১৮২৯ খ্রি. ১ জুন সংস্কৃত কলেজে ভরতি হন। একাদি ক্রমে ১২ বছর কাব্য, ব্যাকরণ, অলংকার, বেদান্ত, স্মৃতি, ন্যায়, জ্যোতিষ প্রভৃতি পাঠ করে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। অবশেষে ১৮৩৯ খ্রি. হিন্দু ল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর 'বিদ্যাসাগর' উপাধি পান। ১৮৪১ খ্রি. ২৯ ডিসেম্বরে হেড পন্ডিতের চাকরীপান ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে ।এখানে আসার পর ইংরেজি ও হিন্দি শিক্ষায় মনোনিবেশে করেন । ১৮৪৬ খ্রি. ৬ এপ্রিলে কলেজের সহ-সম্পাদক হয়েও তার কলেজ- সংস্কারের প্রস্তাব সম্পাদক অগ্রাহ্য করলে তিনি ১৮৪৭ খ্রি. ১৬ জুলাই পদত্যাগ করেন। অবশ্য তার কিছুদিন পরেই ১৮৫০ খ্রি. উক্ত কলেজের সাহিত্যাধ্যাপকের পদগ্রহণ করেন। তবে; শর্ত ছিল তাঁর প্রস্তাব মতো কলেজ-সংস্কার করতে হবে। এই সময়ে সম্পাদক রসময় দত্ত অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ১৮৫১ খ্রি. অধ্যক্ষপদে নিযুক্ত হয়ে কলেজের সর্ববিভাগের ঐতিহাসিক সংস্কার সাধন করেন। সে কলেজের ছূটির দিন পরিবর্তন,মাইনে প্রবর্তন,জটিল ব্যাকরণ মুগ্ধবোধের পরিবর্তে সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা (পরে ব্যাকরণ কৌমুদী) রচনা করেন। গণিতে ইংরেজি ব্যবহার এবং পাঠক্রমে করে বেদান্তকে ভুয়ো দর্শন বলে বাদ দিয়ে ঢোকালেণ মিলের লজিক বা যুক্তি শাস্ত্র। তার সময়েই সংস্কৃত কলেজে অব্রাহ্মণের প্রবেশাধিকার ঘটে। এ প্রসঙ্গে তার সীমা বদ্ধতা ছিলনা তা নয়। তিনি তার সহকর্মী পন্ডিতদের অন্ধ-মানসিকতা জানতেন, তাই শূদ্রদের মধ্যে তখন কেবল উচ্চ কায়স্থকে প্রথমে যুক্ত করেন। তার চেয়ে বেশি অগ্রসর হননি। বিদ্যাসাগর বিশেষজ্ঞ বিনয় ঘোষ তার বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ গ্রন্থে (৫৩৯-৪৭ পাতায় ) যে সব দলিল সংকলিত করেছেন, তা সময়েরবিচারে প্রনিধান যোগ্য।
শিক্ষা আন্দোলনঃ বাংলা শিক্ষা ও বাঙালির শিক্ষা প্রসারে তার ছিলো সুবিশাল অবদান। সে সরকারকে বুঝিয়ে বাংলার জেলায় জেলায় ২০টি মডেল স্কুল খোলেন। এইসব স্কুলের শিক্ষকদের শিক্ষণ-পদ্ধতি শিক্ষার জন্য নিজ তত্ত্বাবধানে 'নর্মাল স্কুল' প্রতিষ্ঠা করেন (১৮৫৫)। এর পরিচালক করে ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্তকে। ১৮৫৭ খ্রি. প্রতিষ্ঠিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য ছিলেন। ১৯৫৯ খ্রি. 'ক্যালকাটা ট্রেনিং স্কুল' প্রতিষ্ঠার পর ১৮৬৪ খ্রি. এই প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব তাঁর হাতে আসে। এই স্কুলই প্রথমে 'হিন্দু মেট্রোপলিটান ইনস্টিটি উশন' এবং পরে ১৮৭২ খ্রি. কলজে রূপান্তরিত হয়, ( বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) । দেশীয় অধ্যাপকগণ দ্বারাই এই কলেজে ইংরেজি সাহিত্য পড়ানো হোত।
না রী শিক্ষাঃতার সময়ে হিন্দু সমাজে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো পাপ মনে করা হতো। এই অন্ধকার যুগে সরকার কর্তৃক বিশেষ স্কুল ইনেস্পেক্টর নিযুক্ত হওয়ার পরেই যেমন ২০টি মডেল স্কুল স্থাপন করেন। তেমনি ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় পরিচালনা করেন । স্ত্রীশিক্ষার সেই আদি(১৮৫৮)যুগেই বিদ্যাসাগর-প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়গুলির ছাত্রী সংখ্যা ছিল ১৩০০ ।তিনি ১৮৫৭-৫৮ সালে নদীয়া, বর্ধমান, হুগলিতে নিজের খরচে এই ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় করেন। বেথুন স্কুলের সম্পাদক হয়ে মেয়েদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা চালু করেন। বলতেন — "একজন পুরুষ শিক্ষিত হলে একজন শিক্ষিত হয়, একজন নারী শিক্ষিত হলে গোটা পরিবার শিক্ষিত হয়। শিক্ষা যাতে শুধু কলকাতায় আটকে না থাকে, গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে — এটাই ছিলো তার পরিকল্পনা। আমাদের জানা মতে এই কাজ গ্রাম বাংলায় আর করেছিলেন ফরিদপুরের হরিচাঁদ ঠাকুর (১৮১২-১৯৪১) ও তার পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর (১৮৪৬-১৯৩৭)। তারা হাই স্কুল,বালিকা স্কুল সহ খুলেছিলেন কয়েক হাজার গ্রাম্য পাঠশালা । এই আন্দোলনের শীর্ষে ছিলেন ভারতের দলিত শিক্ষাগুরু মহারাষ্ট্রের জ্যোতিরাও ফুলে (১৮২৭ - ১৮৯০ ) ও তার স্ত্রী সাবিত্রীবাই ফুলে(১৮৩১ - ১৮৯৭ )।তারাই ভারতের প্রকৃত নারী ও দলিত শিক্ষার তথা গণ শিক্ষার জনক জননী।
বাংলা গদ্যের জনকঃ বর্ণপরিচয় (১৮৫৫) দিয়েই আজও বাঙালি অক্ষর চেনে। যতি চিহ্ন, সরল গদ্য তারই সৃষ্টি। বাংলা ভাষার শিক্ষা ও বিকাশে সব্যসাচী-বিদ্যাসাগরের অবদানের তুলনা নেই।তিনি প্রশাসক হিসেবে সার্বিক উন্নয়নের পরিবেশ ও পরিকাঠামো সৃজন করছেন আর লেখক অনুবাদক শিক্ষক হিসেবে পাঠ্যের উপযোগী গ্রন্থ রচনা করছেন। ছাত্রদের প্রয়োজন মেটাতেই তিনি বাংলা ভাষায় বই লেখা শুরু করেন, যাতে ইংরেজি না জানলেও শিক্ষা হয়। ক্রমে স্কুল বিভাগের সর্বস্তরে শিক্ষার জন্য বহুবিধ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন যেমন বোধোদয়, বর্ণপরিচয়, কথামালা , 'চরিতাবলী', 'ঋজুপাঠ' প্রভৃতি। বাংলা ভাষার দেহে রক্তসঞ্চালনের জন্য ও সংস্কৃত-সিক্ত বাংলাকে মুক্তির স্বাদ দিতে নতুন ভাবে লিখলেন বেতাল পঞ্চবিংশতি', 'শকুন্তলা', 'সীতার বনবাস' প্রভৃতি। যে রচনা্র মাধ্যমে তিনি সাহিত্যের নতুন দিক-নির্দেশ করেন। এ ছাড়াও 'রঘুবংশ', 'সর্বদর্শন সংগ্রহ', 'কুমারসম্ভব', 'কাদম্বরী', 'মেঘদূত', 'উত্তররামচরিত', 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম্' প্রভৃতি গ্রন্থ সম্পাদনা করেন। সহকর্মী মদন মোহন তর্কালঙ্কারের সঙ্গে 'সংস্কৃত-প্রেস'ও স্থাপন করেন।
বিধবা বিবাহঃ ১৮৫৪-৫৫ খ্রি. বিধবা বিবাহ প্রচলন-প্রয়াস চালান। শাস্ত্র ঘেঁটে 'পরাশর সংহিতা' থেকে প্রমাণ করেন বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত। ১৮৫৫ সালে হাজার স্বাক্ষর সহ আবেদন করে ১৮৫৬ সালের ২৬শে জুলাই Hindu Widows' Remarriage Act XV পাশ করান। ১৮৫৬ সালের ৭ই ডিসেম্বর প্রথম বিধবা বিবাহ দেন নিজের ছেলের বন্ধুর সাথে, নিজে উপস্থিত থেকে। নিজের ছেলে নারায়ণচন্দ্রকেও বিধবার সাথে বিয়ে দেন। প্রায় ৬০টির বেশি বিধবা বিবাহ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দিয়েছিলেন।তবুও কেন পূর্ণ সফল হল না? উচ্চবর্ণের রক্ষণশীলরা তাকে 'বিধবা-বিবাহের ঠাকুর' বলে ব্যঙ্গ করত, সামাজিক বয়কট করত।আর ছিলো অর্থনৈতিক কারণ। বিধবাদের সম্পত্তির অধিকার ছিল না, তাই দ্বিতীয় বিয়ে করলে পরিবার তাদের ত্যাজ্য করত। আইন পাশ হলেও পুলিশ বা সমাজ তা মানতে বাধ্য করত না। তিনি নিজেই শেষ জীবনে হতাশ হয়ে বলেছিলেন — "বিধবা বিবাহ আন্দোলন আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও কম সফল কাজ।" আজথেকে প্রায় ২০০বছর আগের অত্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন হিন্দু সমাজে বহুবিবাহ-রোধ আন্দোলন ব্যর্থ হয়,সমাজপতিদের প্রবল বাধাঁয় আর সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকারের ভীত হয়ে পড়ে,তাই । এই উপলক্ষ্যে শিক্ষিত মহলে তীব্র বাদানুবাদের সৃষ্টি হলে বিদ্যাসাগর সম্পূর্ণ নূতন ভঙ্গিতে সরস ও বিদ্রূপাত্মক নিবন্ধ রচনা করেন। গ্রন্থাকারে সেগুলির নাম- 'কস্যচিৎ ভাইপোস্য', 'অতি অল্প হইল', 'আবার অতি অল্প হইল' (১৮৭৩)। হিন্দু বিধবাদের দুরবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি 'হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুয়িটি ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করেন।
সারা জীবন কঠোর সংগ্রামী, স্বাজাত্যাভিমানী আর কোনো কারণেই আপস না করা।— এই ছিল বিদ্যাসাগরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। ফলে শেষজীবনে আত্মীয়-বন্ধুজন থেকে দূরে কার্মাট…সাঁওতালদের মধ্যে বসবাস করতেন। তাদের সরল সান্নিধ্যই তার জীবনের ছিলো শ্যামল পূর্ণতা ।
বাঙালির শিক্ষক দিবস! বর্ণবাদী কুসংস্কারে নিমজ্জিত বঙ্গ সমাজের মানবিক সংস্কার , বাংলা গদ্যের সুস্বাস্থ্য ও সৈন্দর্য সৃজণ তথা বাংলা গদ্যের জনক বিদ্যাসাগর আজও সমগ্র বাংলা বিশ্বের অদ্বিতীয় ও আদর্শ শিক্ষক। তাই আমাদের মতো সাধারণ ভাষাকর্মী থেকে কলকাতার প্রখ্যাত ভাষা বিদ পবিত্র সরকার, প্রাচীন সাহিত্য বিশারদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি, কবি জয় গোস্বামী, প্রাঃ উপাচার্য সবুজকলি সেন সহ অনেকেই চেয়েছেন বিদ্যাসাগরের জন্ম দিন বাংলার শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হোক । কারণ বিদ্যাসাগর হলেন আমাদের ঘরে ঘরে বাংলা বর্ণমালা পৌঁছে দেওয়ার মহান পথিকৃৎ বা কারিগর। তাই বাংলার শিক্ষা দিবস হিসেবে তাঁর জন্মদিন সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক দিন বলে আমাদেরও মনে হয়।